রাসুলের ﷺ ৭টি অভ্যাসে রয়েছে ৭টি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

রাসুল ﷺ— যার জীবনের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আমল গোটা মানবজাতির জন্য আদর্শ ও অনুকরণীয়। তার জীবনের কার্যাবলি উম্মতের জন্য সুন্নাহ হিসেবে যেমন অনুসরণীয়, উপকারিতার দিক থেকেও তেমন অনন্য। যুগ যুগ ধরে রাসুলের ﷺ জীবনধারার বিভিন্ন অভ্যাস ও আমল এবং কর্ম ও ইবাদত নিয়ে গবেষণা হচ্ছে আর নতুন নতুন বিস্ময়ে অভিভূত হচ্ছে গোটা পৃথিবী।
রাসুল ﷺ কখন কী করতেন, কেন করতেন— এসব কিছুর উত্তর খুঁজেছেন গবেষকরা আর বের করে এনেছেন চমৎকার সব ফলাফল-উপকারিতার বার্তা। রাসুলের ﷺ বেশ কিছু অভ্যাস নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে— তার এসব অভ্যাস মানবদহের জন্য বেশ উপকারী। চলুন আমরা রাসুলের ﷺ এমন ৭টি অভ্যাসের কথা জেনে নেই; যার প্রতিটি অভ্যাসে রয়েছে স্বাস্থ্যগত উপকারিতা।

অভ্যাস— ০১ : খুব সকালে (শেষ রাতে) ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া
রাসুল ﷺ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে জাগতেন এবং দিনের কাজ শুরু করতেন। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসুল ﷺ নিয়মিত শেষরাতে ঘুম থেকে উঠতেন এবং তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল ﷺ শেষরাতে জাগ্রত হতেন। [বুখারি, ১১২০]

উপাকারিতা : স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের গবেষণায় আজ একথা প্রমাণিত যে, সকাল সকাল ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া মানুষের মধ্যে প্রোডাক্টিভিটি বেশি থাকে। আর যারা দ্রুত ঘুম থেকে উঠেন তাদের হতাশ কিংবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকাংশে থাকে কম।

অভ্যাস— ০২ : স্বল্প আহার গ্রহণ করা
সর্বদা অল্প আহার গ্রহণের অভ্যাস ছিল রাসুলের ﷺ। স্বল্প খাবার খেতেন তিনি। হজরত মিকদাম ইবন মাদিকারাব রা. বলেন, আমি রাসুলকে ﷺ বলতে শুনেছি— মানুষ পেট ভর্তি অপেক্ষা আর কোনো নিকৃষ্টতর পাত্র পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের জন্য ততটুকু খাদ্য যথেষ্ট, যতটুকু খাবার তার পিঠ সোজা করে রাখে। আর যদি এর চেয়ে বেশি খেতেই হয়, তাহলে পেটের তিন ভাগের এক ভাগ খাবার, এক ভাগ পাণীয় এবং বাকি এক ভাগ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রেখে কাবার গ্রহণ করা উচিত [তিরমিজি, ২৩৮৩]

উপকারিতা : বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে, স্বল্প আহার গ্রহণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের কারণেই মানুষের ৮০ শতাংশ রোগব্যাধি হয়ে থাকে। প্রফেসর রিচার্ড বার্ডের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে বেশি খাদ্য খেলে মস্তিষ্কের ব্যাধি, চক্ষুরোগ, জিহ্বা ও গলার ব্যাধি, বক্ষ ও ফুসফুসের ব্যাধি, হৃদেরাগ, যকৃৎ ও পিত্তের রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দুশ্চিন্তাগ্রস্ততাসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি সৃষ্টি হয়। [সুন্নাতে রাসুল ও আধুনিক বিজ্ঞান]

অভ্যাস— ০৩ : আস্তে-ধীরে খাদ্য-খাবার গ্রহণ করা
খুব ধীরে ধীরে খাবার খেতেন রাসুল ﷺ। একসঙ্গে বেশি খাবার-খাদ্য মুখে দিতেন না তিনি এবং খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস ছিল তার। রাসুল ﷺ তিন আঙুলে খেতেন এবং খাওয়ার পর জিহবা দিয়ে আঙুল ভালোভাবে চেটে খেতেন। [বোখারি ও মুসলিম]

উপকারিতা : ধীরে-সুস্থে খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত। বিজ্ঞানীতের মতে, এতে খাবার ভালো করে চিবানো হয়। যার ফলে মুখের লালা খাদ্যের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারে এবং এতে হজম সহজতর হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, তাড়াহুড়া করে খাবার খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, পেট ফাঁপা, অ্যাসিডিটিসহ অন্যান্য অসুখ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে খাবার না চিবিয়ে খেলে মেটাবলিক সিনেড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অভ্যাস— ০৪ : পরিবারের সঙ্গে খাবার খাওয়া
রাসুল ﷺ অধিকাংশ সময় পরিবারের সঙ্গে খাবার খেয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে খাওয়া সম্ভব না হলে সাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে একসাথে খাবার খেয়েছেন। হজরত আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ আমাকে তার সঙ্গে খেতে ডাকলেন। হাড়অলা গোস্ত নিয়ে আমাকে খেতে দিলেন। আমি সেই গোস্ত কিছুটা খেয়ে রেখে দিলাম। রাসুল ﷺ সেটা হাতে নিয়ে ঠিক আমি সেখানে মুখ লাগিয়েছি, সেখানে মুখ লাগিয়ে খেলেন। এরপর তিনি আমাকে পানি খেতে বললেন। পানি খেয়ে আমি পেয়ালাটা রেখে দিলাম। এরপর তিনি পেয়ালার ঠিক সেখানেই ঠোট ছোয়ালেন, যেখানে ঠোট ছুইয়েছিলাম আমি। [মুসলিম, ৩০০; মুসনাদে আহমাদ, ২৪৩২৮]

উপকারিতা : মনবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেলে মানুষের মানসিক চাপ অনেকাংশে কমে যায়। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব শিশু-কিশোররা সপ্তাহে অন্তত ৪/৫দিন পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে রাতের খাবার গ্রহণ করে করে; তারা পড়াশুনায় এগিয়ে থাকে। ব্রিঘাম ইয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের করা সমীক্ষায় দেখা যায়, ফ্যামিলি ডিনার যে কোনও ধরনের মানসিক স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া আরো এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘক্ষণ কাজের জায়গায় কাটানোর পরে বাসায় ফিরে সবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার সারলে অনেকটা স্বস্তি ও সুখ মিলে।

অভ্যাস— ০৫ : তিন শ্বাসে পানি পান করা এবং পানিতে ফু না দেওয়া
রাসুল ﷺ তিন শ্বাসে পানি পান করতেন এবং খাবার বা কোনো পাণীয়তে কখন ফু দিতেন না। রাসুল ﷺ যখন পান করতেন তিন শ্বাসে পান করতেন। তিনি বলতেন, এভাবে পান করলে কষ্ট কম হয় এবং পিপাসা নিবারণে অধিক কার্যকর ও স্বাস্থ্যসম্মত পন্থা এটি। [আবু দাউদ, ৩৭২৭] হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। কোনো কিছু পান করার সময়ও তিনি ফুঁ দিতেন না। [ইবনে মাজাহ,৩৪১৩]

উপকারিতা : চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য নাক ও মুখ দিয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে এবং অক্সিজেন গ্রহণ করে। পানিতে বা খাবার ফু দিলে নিশ্বাসের সাথে কার্বন ডাই-অক্সাইড পানিতে মিশে যায় এবং তা শরীরে প্রবেশ করে ক্ষতি করে। এছাড়া বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, কোনো প্রকার গ্যাপ না দিয়ে একসঙ্গে একশ্বাসে পানি পান করার দ্বারা রক্তের ইলেক্ট্রোলাইটগুলোতে মাথা ব্যাথা, মাথা ঘোরা এবং ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।

অভ্যাস— ০৬ : সিয়াম পালন করা বা উপবাস থাকা
রাসূল ﷺ রমজান মাসে নিয়মিত রোজা রাখতেন বলে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণনা পাওয়া যায়। রাসুল ﷺ নিজে রোজা রেখেছেন এবং উম্মাহকে রোজা রাখার নির্দেশ নিয়েছেন। রোজা ইসলামের একটি ফরজ বিধান। রাসুল ﷺ রমজান মাস ছাড়াও অন্যান্য মাসেও রোজা রাখতেন। সকালে ঘরে খাওয়ার মতো কিছু না থাকলে রাসুল ﷺ বলতেন, তা হলে আজ আমি সিয়াম রাখছি। [বুখারি, ১৪৯৮; মুসলিম, ১০৭৬; তিরমিজি, ৭৩৩; মুসনাদে আহমাদ, ২৪২২০]

উপকারিতা : রোজায় স্বাস্থ্যগত উপকারিতার কথা আজ বিশ্বময় স্বীকৃত। বিশ্বের বাঘা বাঘা চিকিৎসাবিজ্ঞানী রোজার উপকারিতার কথা স্বীকৃতি দিয়েছেন। রোজা রাখার কারণে ওজন হ্রাস পায়, রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল কমে আসে, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত হলো, রোজা আলসার বৃদ্ধি করে না। সম্প্রতি জাপানী বিজ্ঞানীরা রমজান মাসে রোজা রাখার ঘোষণা করেছে এবং তারা বলছে, রোজা রাখা বা উপবাস করা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর একটি পদ্ধতি।

অভ্যাস— ০৭ : নিয়মিত খেজুর খাওয়া
নিয়মিত খেজুর খেতেন রাসুল ﷺ । তার প্রিয় খাবারের তালিকাতে অন্যতম ছিল খেজুর। রাসুল ﷺ বলেছেন, যে বাড়িতে খেজুর নেই, সে বাড়িতে কোনো খাবার নেই। (আল হাদিস) রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালবেলা সাতটি আজওয়া (উৎকৃষ্ট) খেজুর খাবে, সেদিন কোনো বিষ ও জাদু তার ক্ষতি করবে ননা। [বোখারি, ৫৪৪৫]

উপকারিতা : খেজুরের রয়েছে অনেক পুষ্টিকর উপাদান। খেজুর ক্যান্সার প্রতিরোধ, দুর্বল হৃদপিণ্ডের সবচেয়ে নিরাপদ ওষুধ খেজুর, দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিকারক, শিশুদের মাড়ি শক্ত করতে সাহায্য করে খেজুর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও প্রতিরোধ করে। এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে, সংক্রমণ রোধকারক এবং ক্যালসিয়াম হাড় গঠনে সহায়ক খেজুর। খেজুর দেহে রক্তশর্করার পরিমাণ স্থির রাখে। ইলেক্ট্রোলাইট শরীরের রক্তসমতা ও ভারসাম্য রক্ষা করে। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, খেজুর দেহে অক্সিকোটিন উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় আর এটা মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Main Menu